১২:৫২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
ক্ষমতার রাজনীতি নয়, সংগ্রামই যার পরিচয়

আদর্শের বাতিঘর আসাদুল্লাহ তারেক

  • সংগ্রাম দত্ত
  • আপডেট টাইম : ১০:০৭:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
  • 109

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারিত হয় নিঃশব্দ শ্রদ্ধায়। তাঁরা আলোচনার শিরোনামে কম থাকেন, কিন্তু ইতিহাসের গভীরে তাঁদের অবদান অমলিন। আসাদুল্লাহ তারেক ঠিক তেমনই একজন মানুষ। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আসাদুল্লাহ তারেকের জন্মদিন আজ, ২০ জানুয়ারি। ১৯৫৬ সালের এই দিনে কুমিল্লার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। রাজনীতি ও আইন—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর জীবন ছিল আপসহীন আদর্শের নিরবিচ্ছিন্ন অনুশীলন।

শৈশবের স্মৃতি থেকে রাজনীতির বীজ

রাজনীতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় খুব অল্প বয়সেই। শৈশব থেকেই পারিবারিক পরিবেশে রাজনীতির আলোচনা ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। যেহেতু আমার পিতা ওই দলের একজন সক্রিয় রাজনৈতিক ছিলেন, তাই মাত্র ৯–১০ বছর বয়সেই তাঁর মুখে প্রথম শুনেছিলাম আসাদুল্লাহ তারেক আঙ্কেলের নাম। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেই নাম তখনই আলাদা করে দাগ কেটেছিল—কারণ তা উচ্চারিত হতো সংগ্রাম, সততা আর আদর্শের সঙ্গে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবনে তিনি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ন্যাপ রাজনীতির আদর্শে দীক্ষিত হন। বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একনিষ্ঠ কর্মী থেকে ছাত্রনেতা হিসেবে গড়ে ওঠেন তিনি। তাঁর রাজনৈতিক বিকাশ ছিল ধীর, গভীর এবং সংগ্রামনির্ভর।

 

ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক উত্থান

 

১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ঐতিহাসিক ‘দশ দফা’ আন্দোলনের প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। সেই সময়ের রাজনীতি ছিল আদর্শ ও ত্যাগের—আর আসাদুল্লাহ তারেক ছিলেন সেই ধারারই প্রতিনিধি।

মুক্তিযুদ্ধ: নীরব কিন্তু দৃঢ় ভূমিকা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করলেও, মেজর হায়দারের অধীনে ২ নং সেক্টরে গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর প্রচার ও প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে মার্চ মাসে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যদের প্রশিক্ষণেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

এই অবদান হয়তো বন্দুকের গর্জনে দৃশ্যমান ছিল না, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সহায়ক শক্তি হিসেবে তা ছিল অপরিহার্য। তবুও বাস্তবতার নির্মমতায় অনেক প্রকৃত সংগ্রামীর মতো তিনিও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরে থেকে গেছেন—যা আমাদের ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়।

স্বাধীনতার পর আদর্শের কঠিন পথ

স্বাধীনতার পর ন্যাপ (মোজাফফর) ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দেশের রাজনীতিতে গঠনমূলক বিরোধী শক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধর্ম, কর্ম ও সমাজতন্ত্রের সমন্বয়ে ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি গড়ে তোলার এই প্রয়াসে আসাদুল্লাহ তারেক ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য সংগঠক ও চিন্তক।

দলীয় বিভাজন, দমন-পীড়ন, মামলা-হামলা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও তিনি বড় রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে ‘টার্নকোট’ রাজনীতির পথে হাঁটেননি। আদর্শের প্রশ্নে আপস না করার এই দৃঢ়তা তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করে।

 

আদালতে সংগ্রাম, রাজপথের প্রতিধ্বনি

 

আইন পেশায় তিনি সুপ্রিম কোর্টের একজন সম্মানিত আইনজীবী। রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তিনি বরাবরই সোচ্চার। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সংগ্রামীদের স্বীকৃতির দাবিতে হাইকোর্টে রিটসহ তাঁর আইনি লড়াই ইতিহাসে স্মরণযোগ্য হয়ে থাকবে। আজও বহু বঞ্চিত সংগ্রামী তাঁর এই ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞ।

আজও অবিচল এক আদর্শযোদ্ধা

বর্তমানে তিনি ঐক্য ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নেতা। শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ, প্রকৃত গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাই তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য। রাজপথের আন্দোলন হোক কিংবা মতাদর্শিক লড়াই—অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি আজও আপসহীন।

আসাদুল্লাহ তারেক এমন এক রাজনীতিবিদ, যিনি ক্ষমতার মোহে নয়, আদর্শের টানেই রাজনীতি করেন। তাঁর জীবনের অনেক লক্ষ্য আজও অসমাপ্ত, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন—গণতান্ত্রিক পথে, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই একদিন সমাজ বদলাবে।

শ্রদ্ধার নিবেদন

জন্মদিনে তাঁর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা। আসাদুল্লাহ তারেকের জীবন ও সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আদর্শিক রাজনীতি শুধু অতীতের গল্প নয়, এটি আজও সম্ভব, আজও প্রাসঙ্গিক।

এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

Tag :
About Author Information

আদর্শের বাতিঘর আসাদুল্লাহ তারেক

ক্ষমতার রাজনীতি নয়, সংগ্রামই যার পরিচয়

আদর্শের বাতিঘর আসাদুল্লাহ তারেক

আপডেট টাইম : ১০:০৭:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারিত হয় নিঃশব্দ শ্রদ্ধায়। তাঁরা আলোচনার শিরোনামে কম থাকেন, কিন্তু ইতিহাসের গভীরে তাঁদের অবদান অমলিন। আসাদুল্লাহ তারেক ঠিক তেমনই একজন মানুষ। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আসাদুল্লাহ তারেকের জন্মদিন আজ, ২০ জানুয়ারি। ১৯৫৬ সালের এই দিনে কুমিল্লার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। রাজনীতি ও আইন—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর জীবন ছিল আপসহীন আদর্শের নিরবিচ্ছিন্ন অনুশীলন।

শৈশবের স্মৃতি থেকে রাজনীতির বীজ

রাজনীতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় খুব অল্প বয়সেই। শৈশব থেকেই পারিবারিক পরিবেশে রাজনীতির আলোচনা ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। যেহেতু আমার পিতা ওই দলের একজন সক্রিয় রাজনৈতিক ছিলেন, তাই মাত্র ৯–১০ বছর বয়সেই তাঁর মুখে প্রথম শুনেছিলাম আসাদুল্লাহ তারেক আঙ্কেলের নাম। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেই নাম তখনই আলাদা করে দাগ কেটেছিল—কারণ তা উচ্চারিত হতো সংগ্রাম, সততা আর আদর্শের সঙ্গে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবনে তিনি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ন্যাপ রাজনীতির আদর্শে দীক্ষিত হন। বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একনিষ্ঠ কর্মী থেকে ছাত্রনেতা হিসেবে গড়ে ওঠেন তিনি। তাঁর রাজনৈতিক বিকাশ ছিল ধীর, গভীর এবং সংগ্রামনির্ভর।

 

ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক উত্থান

 

১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ঐতিহাসিক ‘দশ দফা’ আন্দোলনের প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। সেই সময়ের রাজনীতি ছিল আদর্শ ও ত্যাগের—আর আসাদুল্লাহ তারেক ছিলেন সেই ধারারই প্রতিনিধি।

মুক্তিযুদ্ধ: নীরব কিন্তু দৃঢ় ভূমিকা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করলেও, মেজর হায়দারের অধীনে ২ নং সেক্টরে গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর প্রচার ও প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে মার্চ মাসে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যদের প্রশিক্ষণেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

এই অবদান হয়তো বন্দুকের গর্জনে দৃশ্যমান ছিল না, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সহায়ক শক্তি হিসেবে তা ছিল অপরিহার্য। তবুও বাস্তবতার নির্মমতায় অনেক প্রকৃত সংগ্রামীর মতো তিনিও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরে থেকে গেছেন—যা আমাদের ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়।

স্বাধীনতার পর আদর্শের কঠিন পথ

স্বাধীনতার পর ন্যাপ (মোজাফফর) ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দেশের রাজনীতিতে গঠনমূলক বিরোধী শক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধর্ম, কর্ম ও সমাজতন্ত্রের সমন্বয়ে ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি গড়ে তোলার এই প্রয়াসে আসাদুল্লাহ তারেক ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য সংগঠক ও চিন্তক।

দলীয় বিভাজন, দমন-পীড়ন, মামলা-হামলা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও তিনি বড় রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে ‘টার্নকোট’ রাজনীতির পথে হাঁটেননি। আদর্শের প্রশ্নে আপস না করার এই দৃঢ়তা তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করে।

 

আদালতে সংগ্রাম, রাজপথের প্রতিধ্বনি

 

আইন পেশায় তিনি সুপ্রিম কোর্টের একজন সম্মানিত আইনজীবী। রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তিনি বরাবরই সোচ্চার। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সংগ্রামীদের স্বীকৃতির দাবিতে হাইকোর্টে রিটসহ তাঁর আইনি লড়াই ইতিহাসে স্মরণযোগ্য হয়ে থাকবে। আজও বহু বঞ্চিত সংগ্রামী তাঁর এই ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞ।

আজও অবিচল এক আদর্শযোদ্ধা

বর্তমানে তিনি ঐক্য ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নেতা। শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ, প্রকৃত গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাই তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য। রাজপথের আন্দোলন হোক কিংবা মতাদর্শিক লড়াই—অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি আজও আপসহীন।

আসাদুল্লাহ তারেক এমন এক রাজনীতিবিদ, যিনি ক্ষমতার মোহে নয়, আদর্শের টানেই রাজনীতি করেন। তাঁর জীবনের অনেক লক্ষ্য আজও অসমাপ্ত, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন—গণতান্ত্রিক পথে, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই একদিন সমাজ বদলাবে।

শ্রদ্ধার নিবেদন

জন্মদিনে তাঁর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা। আসাদুল্লাহ তারেকের জীবন ও সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আদর্শিক রাজনীতি শুধু অতীতের গল্প নয়, এটি আজও সম্ভব, আজও প্রাসঙ্গিক।

এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।