শ্রীমঙ্গল, যা বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলার সুপ্রসিদ্ধ চা–নগরী হিসেবে পরিচিত, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অবস্থিত। সিলেট সদর থেকে ৫০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং মৌলভীবাজার সদর থেকে ১৩ মাইল দূরে অবস্থিত এই অঞ্চল প্রাচীন ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ। পাহাড়ের পাদদেশে চা–বাগান ও বনাঞ্চলের সৌন্দর্য, ঝরনার শোভা এবং পর্যটন কেন্দ্রের জন্য শ্রীমঙ্গল বিশেষভাবে পরিচিত।
শ্রীমঙ্গল শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং স্বাধীনতা আন্দোলন ও সামাজিক সংগ্রামের ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় শ্রীমঙ্গল এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় স্থানীয় জনগণ বিদেশি পণ্য বর্জন এবং দেশি বস্ত্র পরিধানের মাধ্যমে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু করে। শ্রীমঙ্গলের স্বাধীনতাকামী নেতা ও সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ সুতিবস্ত্র বর্জন, দেশি পণ্যের প্রচার এবং জনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
শ্রীমঙ্গলের আন্দোলনকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন যথাক্রমে ফনি দত্ত পানিনি (ভোজপুর), গিরীজা চৌধুরী (ভোজপুর), যতীন্দ্র মোহন দত্ত চৌধুরী (নোয়াগাঁও), সারদা দাস তরফদার (নোয়াগাঁও), প্রমথ দেব (নোয়াগাঁও), নগেন ঘোষ (সিংবীজ), সুরেশ সোম (উত্তরসুর), যোগেশ চ্যাটার্জি (শ্রীমঙ্গল শহর), জিতেন পাল (রূপশপুর), বড়দা কান্ত সেন (শ্রীমঙ্গল শহর), মহেন্দ্র শর্মা (টিকিরিয়া), সূর্য মণি দেব (রামনগর), বিপিন দাস (উত্তরসুর), যতীন দেব (শ্রীমঙ্গল শহর), মাস্টার গৌড় গোবিন্দ দেব (ভাড়াউড়া), দ্বিজেন ভট্টাচার্য (শ্রীমঙ্গল শহর), মনমোহন ভট্টাচার্য (বৌলাশী), শ্রীশ চন্দ্র দত্ত চৌধুরী ওরফে লাকু দত্ত চৌধুরী (ভুনবীর), লীলা দত্ত চৌধুরী (ভুনবীর), নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী (কালাপুর), হৃদয় দেব (ভাড়াউড়া), অমর দত্ত (ভৈরব বাজার), যশোদা গোবিন্দ গোস্বামী (কালাপুর), ইন্দ্র হোম চৌধুরী (রূপশপুর), মোহাম্মদ ইউনুস উদ্দিন (পাত্রীকূল), নগেন্দ্র ধর (শ্রীমঙ্গল শহর), ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী (শ্রীমঙ্গল পুরানবাজার)।
১৯২০ সালে অসহযোগ আন্দোলন এবং খেলাফত আন্দোলনের জোয়ার শ্রীমঙ্গলেও প্রবাহিত হয়। ১৯২১ সালের ১৫ মার্চ শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, শ্রীমতী বাসন্তী দেবী এবং মৌলানা মোহাম্মদ আলীকে সংবর্ধনা জানানো হয়। ১৯২৮ সালে লাহোর সেন্ট্রাল জেলে মৃত্যুশয্যায় অনশনরত যতীন দাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শ্রীমঙ্গলে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়।
তদুপরি, ১৯৩০–এর দশকে শ্রীমঙ্গলে কংগ্রেসের থানা কমিটি গঠন করা হয়। নলিনী গুপ্ত (সভাপতি) ও সুরেশ সোম (সেক্রেটারি) নেতৃত্ব দেন। ১৯৩২ সালে লবণ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নেতা সীতেশ সোম (উত্তরসুর) নোয়াখালীতে পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন। শ্রীমঙ্গল থানা কংগ্রেস অফিস ব্রিটিশ পুলিশের দ্বারা ধ্বংস করা হয়। এই সময় বিপ্লবী নেতা সূর্য মণি দেব (রামনগর), মুকুন্দ চক্রবর্তী (টিকিরিয়া), মহেন্দ্র শর্মা (টিকিরিয়া), মনমোহন ভট্টাচার্য (বৌলাশী), লাকু দত্ত চৌধুরী (ভুনবীর), লীলা দত্ত (ভুনবীর), রোহিনী দাস (বৌলাশী), সারদা দে (নিশ্চিন্তপুর), সীতেশ সোম (উত্তরসুর) প্রমুখ গ্রেপ্তার হন।
৩০ এর দশকে শ্রীমঙ্গলের পুরানবাজারের ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী (কে. বি. দেব চৌধুরী) কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীকালে ফরওয়ার্ড ব্লকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। শ্রীমঙ্গলের পুরানবাজার এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি স্থানীয় জনগণকে সংগঠিত করতে এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৩৮ সালে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু শ্রীমঙ্গলে এসে জনসভায় ভাষণ দেন। এ ছাড়া ১৯৩৬, ১৯৩৮, ১৯৪৫ ও ১৯৪৬ সালে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু শ্রীমঙ্গলে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও গণভোটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বক্তব্য দেন। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শ্রীমঙ্গলেও জোয়ার নিয়ে আসে। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতি অনুসরণ না করে বিপ্লবী নেতারা কংগ্রেস থেকে ছড়িয়ে পড়ে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে আজাদ হিন্দ ফৌজের সমর্থক শ্রীমঙ্গলের কিছু নেতা ও জনগণ সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেন। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের উত্থানের পর স্থানীয় রাজনীতি আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৪৭ সালে গণভোটে শ্রীমঙ্গলে ভারত ও পাকিস্তানের পক্ষে জনমত প্রভাবিত হয়। ভুনবীর এলাকার লাকু দত্ত চৌধুরী ভারতের অন্তর্ভুক্তির পক্ষে প্রচারণা চালান। পাকিস্তানের পক্ষে ভোট পড়ে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ এবং ভারতের পক্ষে পড়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১। মুসলিম লীগের অধিক ভোটের কারণে তৎকালীন সিলেট জেলা ও শ্রীমঙ্গল এলাকা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।
শ্রীমঙ্গলে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন স্থানীয় নেতা ও সাধারণ জনগণের অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগের ইতিহাস হিসেবে চিহ্নিত। এটি দেশপ্রেম, স্বাধীনচেতা মনোভাব ও সংগ্রামের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আন্দোলনের সময় বহু নেতা গ্রেপ্তার, আহত ও নিহত হলেও জনগণের সংহতি, সাহস ও দেশপ্রেম আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে। শ্রীমঙ্গলের এই ইতিহাস স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে।
সংগ্রাম দত্ত 








