০৪:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ইতিহাস, সংগ্রাম ও স্মৃতির আলেখ্য

দৃঢ় আদর্শের এক নাম: শ্রীমঙ্গলের গঙ্গেশ দেব রায়

  • সংগ্রাম দত্ত
  • আপডেট টাইম : ০৯:৪৩:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 41

শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে যাঁদের নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রয়াত বাবু গঙ্গেশ দেব রায়। শ্রদ্ধেয় গিরীশ চন্দ্র দেব রায়ের সুযোগ্য পুত্র গঙ্গেশ দেব রায় ছিলেন দৃঢ়চেতা ও আদর্শনিষ্ঠ এক রাজনীতিবিদ।

তিনি ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালে শ্রীমঙ্গল থানার ভূনবীর ইউনিয়নের রুস্তমপুর এলাকায় দুষ্কৃতকারীদের হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং সমগ্র ভূনবীর-মির্জাপুর অঞ্চল এবং শ্রীমঙ্গল থানার জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তিনি ছিলেন একজন সংগঠক, জননেতা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। রাজনৈতিক সভা থেকে ফেরার পথে তাঁর ওপর হামলার ঘটনায় এলাকাজুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। ঘটনার পরপরই জড়িতদের গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তীতে তারা পালিয়ে যায়। সময়ের ব্যবধানে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন শোনা গেলেও দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ায় সেসবের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

গঙ্গেশ দেব রায় শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াক্ষেত্রেও ছিলেন এক নিবেদিত পৃষ্ঠপোষক। তাঁর পৈতৃক নিবাস—মৌলভীবাজার রোডস্থ বাসভবন—ছিল মেধা, মনন ও সৃজনশীল চর্চার এক প্রাণকেন্দ্র। সংগীতচর্চা ও প্রগতিশীল ভাবনার আসরে প্রয়াত রঙ্গলাল দেব রায়, শিক্ষক আব্দুল গফুরসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি সমবেত হতেন। শিক্ষাগুরু প্রীতি রঞ্জন চক্রবর্তীর মতো সম্মানিত ব্যক্তিত্বও সেখানে উপস্থিত থেকে তরুণদের অনুপ্রেরণা জোগাতেন।

ষাটের দশকে তিনি ছিলেন সাহসিকতার প্রতীক। আভিজাত্য, রুচিশীলতা, শখ এবং সাংগঠনিক দক্ষতায় সমৃদ্ধ এক পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমকালীনদের কাছে তিনি ছিলেন অনুকরণীয়। তাঁর উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় নিয়মিত ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন হতো। শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর পরিবারের অবদান উল্লেখযোগ্য। বড়ভাই গোপেন্দ্র দেব রায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত স্কুল এবং গোপেন্দ্রগঞ্জ বাজার আজও সেই স্মৃতিকে বহন করছে।

তাঁর গ্রামের বাড়ি ভূনবীর ইউনিয়নের বাদেআলিশা গ্রামে। শিকড়ের সঙ্গে গভীর সংযোগ রেখেই তিনি জনসেবায় নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে তাঁর রাজনৈতিক কর্মদক্ষতা, সংগঠনী ভূমিকা এবং প্রতিকূল সময়ে সাহসী অবস্থান অনেকটাই গল্পের মতো মনে হতে পারে। কারণ আজকের বাস্তবতা থেকে ফিরে তাকালে সেই সময়ের ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ, নীতির প্রশ্নে আপসহীনতা এবং ব্যক্তিগত সাহসের মূল্যায়ন সহজ নয়। তিনি রাজনীতিকে ব্যক্তিস্বার্থের উপায় হিসেবে নয়, বরং জনসেবার অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ, স্পষ্ট অবস্থান এবং সাংগঠনিক দৃঢ়তা তাঁকে অনন্য করে তুলেছিল।

শ্রীমঙ্গল অঞ্চলে দৃঢ় আদর্শ ও নেতৃত্বগুণে যাঁরা স্মরণীয় হয়ে আছেন, গঙ্গেশ দেব রায় তাঁদের অন্যতম।

একই ধারায় ক্ষীরদ বিহারী দেব (কেবি দেব চৌধুরী), ডাঃ সূর্যমনি দেব চৌধুরী, লাকু দত্ত চৌধুরী, যতীন্দ্রমোহন দত্ত চৌধুরী, রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, মোহাম্মদ শাজাহান মিয়া, ডাঃ আব্দুল আলী প্রমুখ ব্যক্তিত্বও শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

গঙ্গেশ দেব রায়ের জীবন ছিল আদর্শ, সাহস ও জনসম্পৃক্ততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এলাকাবাসী বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন একজন জনদরদী, নীতিবান ও দৃঢ়চেতা রাজনীতিবিদকে—যাঁর আদর্শ আজও প্রেরণার উৎস।

Tag :
About Author Information

দৃঢ় আদর্শের এক নাম: শ্রীমঙ্গলের গঙ্গেশ দেব রায়

ইতিহাস, সংগ্রাম ও স্মৃতির আলেখ্য

দৃঢ় আদর্শের এক নাম: শ্রীমঙ্গলের গঙ্গেশ দেব রায়

আপডেট টাইম : ০৯:৪৩:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে যাঁদের নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রয়াত বাবু গঙ্গেশ দেব রায়। শ্রদ্ধেয় গিরীশ চন্দ্র দেব রায়ের সুযোগ্য পুত্র গঙ্গেশ দেব রায় ছিলেন দৃঢ়চেতা ও আদর্শনিষ্ঠ এক রাজনীতিবিদ।

তিনি ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালে শ্রীমঙ্গল থানার ভূনবীর ইউনিয়নের রুস্তমপুর এলাকায় দুষ্কৃতকারীদের হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং সমগ্র ভূনবীর-মির্জাপুর অঞ্চল এবং শ্রীমঙ্গল থানার জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তিনি ছিলেন একজন সংগঠক, জননেতা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। রাজনৈতিক সভা থেকে ফেরার পথে তাঁর ওপর হামলার ঘটনায় এলাকাজুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। ঘটনার পরপরই জড়িতদের গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তীতে তারা পালিয়ে যায়। সময়ের ব্যবধানে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন শোনা গেলেও দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ায় সেসবের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

গঙ্গেশ দেব রায় শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াক্ষেত্রেও ছিলেন এক নিবেদিত পৃষ্ঠপোষক। তাঁর পৈতৃক নিবাস—মৌলভীবাজার রোডস্থ বাসভবন—ছিল মেধা, মনন ও সৃজনশীল চর্চার এক প্রাণকেন্দ্র। সংগীতচর্চা ও প্রগতিশীল ভাবনার আসরে প্রয়াত রঙ্গলাল দেব রায়, শিক্ষক আব্দুল গফুরসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি সমবেত হতেন। শিক্ষাগুরু প্রীতি রঞ্জন চক্রবর্তীর মতো সম্মানিত ব্যক্তিত্বও সেখানে উপস্থিত থেকে তরুণদের অনুপ্রেরণা জোগাতেন।

ষাটের দশকে তিনি ছিলেন সাহসিকতার প্রতীক। আভিজাত্য, রুচিশীলতা, শখ এবং সাংগঠনিক দক্ষতায় সমৃদ্ধ এক পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমকালীনদের কাছে তিনি ছিলেন অনুকরণীয়। তাঁর উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় নিয়মিত ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন হতো। শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর পরিবারের অবদান উল্লেখযোগ্য। বড়ভাই গোপেন্দ্র দেব রায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত স্কুল এবং গোপেন্দ্রগঞ্জ বাজার আজও সেই স্মৃতিকে বহন করছে।

তাঁর গ্রামের বাড়ি ভূনবীর ইউনিয়নের বাদেআলিশা গ্রামে। শিকড়ের সঙ্গে গভীর সংযোগ রেখেই তিনি জনসেবায় নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে তাঁর রাজনৈতিক কর্মদক্ষতা, সংগঠনী ভূমিকা এবং প্রতিকূল সময়ে সাহসী অবস্থান অনেকটাই গল্পের মতো মনে হতে পারে। কারণ আজকের বাস্তবতা থেকে ফিরে তাকালে সেই সময়ের ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ, নীতির প্রশ্নে আপসহীনতা এবং ব্যক্তিগত সাহসের মূল্যায়ন সহজ নয়। তিনি রাজনীতিকে ব্যক্তিস্বার্থের উপায় হিসেবে নয়, বরং জনসেবার অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ, স্পষ্ট অবস্থান এবং সাংগঠনিক দৃঢ়তা তাঁকে অনন্য করে তুলেছিল।

শ্রীমঙ্গল অঞ্চলে দৃঢ় আদর্শ ও নেতৃত্বগুণে যাঁরা স্মরণীয় হয়ে আছেন, গঙ্গেশ দেব রায় তাঁদের অন্যতম।

একই ধারায় ক্ষীরদ বিহারী দেব (কেবি দেব চৌধুরী), ডাঃ সূর্যমনি দেব চৌধুরী, লাকু দত্ত চৌধুরী, যতীন্দ্রমোহন দত্ত চৌধুরী, রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, মোহাম্মদ শাজাহান মিয়া, ডাঃ আব্দুল আলী প্রমুখ ব্যক্তিত্বও শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

গঙ্গেশ দেব রায়ের জীবন ছিল আদর্শ, সাহস ও জনসম্পৃক্ততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এলাকাবাসী বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন একজন জনদরদী, নীতিবান ও দৃঢ়চেতা রাজনীতিবিদকে—যাঁর আদর্শ আজও প্রেরণার উৎস।